মহাপ্রলয় শুরু হয়েছে

কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশনের ওয়েটিং রুমে তখন শত শত মানুষ। চট্টগ্রামের ট্রেন, সিলেটের ট্রেন, খুলনার ট্রেন, সব দেরি করছে। একটা লোক, গায়ে ময়লা শার্ট, হঠাৎ পাশের মানুষের ঘাড়ে মুখ গুঁজে দিল। সবাই ভাবল মাতাল, নেশাখোর, পাগল। সিকিউরিটি গার্ড লাঠি নিয়ে দৌড়ে এল। লাঠি কাজ করে না এমন কিছুর উপর যেটা ব্যথা পায় না। তিন মিনিটে প্ল্যাটফর্মে যে চিৎকার শুরু হল, সেটা বাইরের রাস্তা পর্যন্ত শোনা গেল।

বাইরে রিকশার ঘণ্টি বাজছিল। মানুষ ফোনে ভিডিও দেখছিল। একটা ভিডিও ফেসবুকে ভাইরাল হল, দশ সেকেন্ডের। নিউমার্কেটের সামনে একটা আপা ছাতা দিয়ে পিটাচ্ছেন একটা লোককে যে বারবার উঠে তার দিকে আসছে। ক্যাপশনে লেখা, ঢাকার আপারা এমনই। পাঁচ লাখ রিঅ্যাক্ট পাঁচ মিনিটে। সবাই হাহা দিচ্ছে। ভিডিওর আপা আর হাসেননি।

সন্ধ্যা ছটা সাতচল্লিশ মিনিটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র সচিবালয়ে জরুরি সংবাদ সম্মেলন করলেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আছে, বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনা ঘটেছে, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। সাতটা পনেরোতে সচিবালয়ের আলো নিভে গেল। আটটা দুই মিনিটে 999 নম্বরে কেউ ধরল না। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের ফেসবুক পেজে শেষ পোস্ট ছিল হেলমেট পরুন, নিরাপদ থাকুন।

ঢাকা বন্ধ করা অসম্ভব। দুই কোটি মানুষ তিনশো বর্গকিলোমিটারে গাদাগাদি করে থাকে। পৃথিবীর সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ শহরগুলোর একটা। গলিগুলো এত সরু যে দুজন পাশাপাশি হাঁটতে পারে না। আপনি মিরপুর রোড বন্ধ করলে মানুষ ধানমন্ডির গলি দিয়ে বের হবে। আপনি গুলশান সিল করলে বনানী দিয়ে ঢুকে যাবে। এই শহরের কোনো মানচিত্র নেই যেটা সত্যিকারের ঢাকাকে দেখায়, কারণ সত্যিকারের ঢাকা প্রতিদিন বদলায়।

পুরান ঢাকা প্রথম পড়ল। শাঁখারী বাজারের গলি যেখানে দুজনে পাশাপাশি হাঁটা যায় না, সেখানে পালানোর রাস্তা নেই। চকবাজারের মোগলাই পরোটার দোকানগুলোতে গরম তেলের কড়াই ছিল, কেউ কেউ সেগুলো অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করল। কাজ হল কয়েক মিনিট। লালবাগ কেল্লার পুরনো দেওয়ালের ভেতরে কিছু মানুষ ঢুকে গেল, মোগল আমলের দরজা বন্ধ করল। দেওয়ালগুলো মোটা, তিনশো বছরের পুরনো। কিন্তু দেওয়ালে ফাটল ছিল, তিনশো বছরের পুরনো ফাটল।

ধানমন্ডি লেকের পাশের বাড়িগুলোতে মধ্যবিত্ত পরিবারগুলো দরজা বন্ধ করে টেলিভিশন চালু রাখল। টেলিভিশনে সংবাদ আসছিল, তারপর হঠাৎ সম্প্রচার বন্ধ হয়ে গেল। স্ক্রিনে শুধু রঙিন দাগ। সাত নম্বর সড়কে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পুরনো বাড়ি, এখন জাদুঘর, অন্ধকারে দাঁড়িয়ে ছিল। যে বাড়িতে ইতিহাস তৈরি হয়েছিল, সে বাড়ি আজ রাতে অন্য ধরনের ইতিহাসের সাক্ষী।

গুলশান আর বনানীর বড় বড় বাড়ি, উঁচু দেওয়াল, সিসিটিভি, আর্মড গার্ড। গার্ডরা আধঘণ্টা দাঁড়িয়ে রইল। তারপর দেওয়াল শুধু ভেতরের মানুষদের বাইরে যেতে বাধা দিল। কূটনৈতিক এলাকায় দূতাবাসের আলো জ্বলছিল, ভেতরে বিদেশিরা নিজেদের দেশে ফোন করার চেষ্টা করছিল। লাইন কাটা।

বুড়িগঙ্গার ওপারে কেরানীগঞ্জ থেকে আগুনের আলো দেখা যাচ্ছিল। নদীর এপারে আহসান মঞ্জিল, ঢাকার গোলাপি প্রাসাদ, রাতের আলোতে এখনও সুন্দর দেখাচ্ছিল। ভেতরে কেউ ছিল না। শুধু পুরনো ছবিগুলো দেওয়ালে ঝুলছিল, নবাবদের চোখ অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে।

জাতীয় সংসদ ভবন, লুই কানের স্থাপত্য, কংক্রিটের জ্যামিতি, পানিতে প্রতিফলন। ভবনটা দাঁড়িয়ে ছিল। আলো নিভে গেছে কিন্তু কাঠামোটা দাঁড়িয়ে ছিল। কংক্রিটের গোলাকার আর ত্রিভুজাকার জানালা দিয়ে ভেতরে বাতাস ঢুকছিল। অন্য কিছুও ঢুকছিল।

ঢাকা চুপ হয়ে গেল। রিকশার ঘণ্টি থেমে গেল। হর্ন থেমে গেল। আজান থেমে গেল।

দুই কোটি মুখ খোলা। কামড়ানোর জন্য।

৭টি ভূমিকা। ২৮ দিন। ভুলের কোনো অবকাশ নেই।

  • 👑
    নেতা
  • 🏃
    স্কাউট
  • 🛡️
    ট্যাঙ্ক
  • 💉
    চিকিৎসক
  • 🍳
    রাঁধুনি
  • 🔧
    প্রযুক্তিবিদ
  • 💀
    টোপ